“আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম। প্রবাসীদের সফলতার গল্প

“আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম। প্রবাসীদের সফলতার গল্প

সফলতার গল্প

আল-হারামাইন সুগন্ধি বিশ্বে একটি পরিবারের নাম। যার জন্ম আরবের বালুকাময় প্রান্তরের প্রাণকেন্দ্রে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০ সালে মধ্য প্রাচ্যে কাজ শুরু করে । মক্কায় তারা সুগন্ধি আগর কাঠের ব্যবসা শুরু করলেও, পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সুগন্ধি তৈরি ও বাণিজ্য শুরু করেন। মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববীর নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। আর আজ “আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম। প্রবাসীদের সফলতার গল্প

আল-হারামাইনের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত কাজী আব্দুল হক, বিশ্বাস করতেন যে, সুগন্ধির একটি শক্তি আছে। একটি সুগন্ধি মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তুলতে পারে, পুরনো স্মৃতিতে নিয়ে যেতে পারে এবং এমনকি এর সামান্য এক ফোঁটা একজন মানুষের মনে শান্তি নিয়ে আসতে পারে। সুগন্ধির এই মোহনীয় যাদুর গোপনীয়তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তারপর থেকেই তিনি তার ব্যবসা বাণিজ্য বাড়াতে থাকেন। এরপরে তার উত্তরসূরীরা আল-হারামাইন নামটি সুনামের সাথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

ধীরে ধীরে আল হারামাইনের এই সুগন্ধি বালুময় আরবের সীমানা ছাড়িয়ে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো পর্যটন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সিলেট জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে ১৯৫৮ সালে জনাব মোহাম্মাদ মাহাতাবুর রহমান নাসির জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা ছিলেন আল হারামাইনের প্রতিষ্ঠাতা, জনাব কাজী আব্দুল হক। তিনি তার পড়ালেখা সিলেট জেলাতেই শেষ করেন। পরে, তিনি সৌদি আরবের মক্কা শহরের পারিবারিক ব্যবসায় যোগদান করেন, যা ছিল “আল হারামাইন পারফিউম” যেটি ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ব্যবসায় যোগ দেবার পর আল হারামাইনের সুগন্ধির ব্যবসাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি বর্তমানে আল হারামাইন গ্রুপ অব কোম্পানিজ এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এনআরবি ব্যাংক এর চেয়ারম্যান।

বাংলাদেশি ব্যবসায়ী কাজী আবদুল হক ১৯৭০ সালে সৌদি আরবে আল হারামাইন পারফিউমস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সৌদি আরব পরিদর্শন করার সময় আব্দুল হক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আগর (অ্যাকিলারিয়া ট্রি) থেকে কস্তুরীর গন্ধ আবিষ্কার করেছিলেন। আগরকাঠ ওউধি তেল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, যা তিনি ‘তরল সোনা’ হিসাবে বর্ণনা করেন। আল হারামাইন সৌদি আরবের শহর মক্কা ও মদীনায় দোকানগুলোর সাথে সুগন্ধির ব্যবসা শুরু করার আগে বাংলাদেশে আগর কাঠের ব্যবসা করতেন।

১৯৮১ সালে, আল হারামাইন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের মুর্শিদ বাজারে একটি দোকান খোলেন। এই সুগন্ধি প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রতিষ্ঠাতার বড় ছেলে মাহতাবুর রহমানের সভাপতিত্বে পরিচালিত হচ্ছে। দুবাইয়ে ব্যবসা- বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮২ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যবসা স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর পরবর্তীতে আল হারামাইন শীঘ্রই আরব আমিরাতে আরও কিছু খুচরা দোকান খুলতে শুরু করেন।

“আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম। প্রবাসীদের সফলতার গল্প
ছবি সংগ্রহ ওয়েবসাইট থেকে

আল হারামাইন জনাব মাহতাবুর রহমানের নেতৃত্বে বেড়ে উঠেছে এবং পুরো জিসিসি, মধ্য প্রাচ্য এবং এর বাইরেও উন্নত মানের সুগন্ধি তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে, প্রতিষ্ঠানটি অসংখ্য বিভিন্ন পণ্য উত্পাদন করেছে এবং বিভিন্ন মানুষের মানুসিকতা, চাহিদা, পছন্দ, রুচি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং ব্যক্তিত্বের সাথে মানিয়ে নিতে সুগন্ধি গুলোতে ব্যতিক্রমী মিশ্রণ তৈরি করেছে।

আল হারামাইন পারফিউম ১,৩০০ টিরও বেশি বিভিন্ন সুগন্ধি উৎপাদন করেছে। “Empress of Perfume” বা সুগন্ধির সম্রাজ্ঞী নামে পরিচিত অন্যান্য সুগন্ধির মধ্যে সর্বাধিক মূল্যবান। প্রতিটি সুগন্ধি ২৪ মিঃলিঃ এর হয়। এই সুগন্ধি ছয় বোতল কিনতে ২৫,০০০ দিরহাম পর্যন্ত খরচ করা লাগতে পারে।

১৯৯২ সালে, আল হারামাইন সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শহর আজমানের রুমাইলাতে আগরকাঠ প্রসেসিং ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে বিনিয়োগ করেন এবং আরব আমিরাতে পারফিউম প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিং শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপতানি সক্ষমতা বা সুবিধা গ্রহণের জন্য দেশটিতে ব্যবসা স্থানান্তর করা হয়েছিল।

১৯৯৭ সালে, আল হারামাইন আজমানের নতুন শিল্প অঞ্চলে একটি ১,৮০,০০০ বর্গফুট সুগন্ধি কারখানা চালু করেছিল।

১৯৯৮ সালে, আল হারামাইন একটি ছোট দোকান নিয়ে কুয়েতের খুচরা বাজারে প্রবেশ করেছিল।

১৯৯৯ সালে, সর্ব প্রথম আল হারামাইন দুবাই এর শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশ করেছিল, পরবর্তীতে তারা অন্যান্য আন্তর্জাতিক শুল্কমুক্ত বাজারে চলে আসে। আজ এটি “আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম

জনাব মাহাতাবুর রহমান বলেন, “১৯৮০ এর সালের শেষের দিকে আমি দুবাইয়ে দু’বার এসেছি এবং দেখেছি এখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করার অনেক সুযোগ রয়েছে। তাই আমরা দুবাইয়ের মুর্শিদ বাজারে আমাদের প্রথম শোরুমটি খুলেছি।”

তিনি আরও বলেন, “দুবাই থেকে বিশ্বজুড়ে পণ্য আমদানি, পণ্য উৎপাদন এবং রফতানি করা অনেক সহজ এই বিষয়টি বুঝতে পেরে, আমরা ১৯৮৭ সালে আমাদের ছোট কারখানাটি সৌদি আরব থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থানান্তরিত করেছি। আমি বিশ্বাস করি দুবাই একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং রফতানির জন্য মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিতে বিস্তার করা সহজ”।

খুব দ্রুত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমগুলির বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ব্যবসায়ের পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি দুবাইতে ১১,০০০ বর্গফুট আয়তনে তার সর্বাধিক আধুনিক প্রধান কার্যালয় তৈরি করেছে এবং আজমানে আল হারামাইন পারফিউমস আরও আধুনিক সুগন্ধি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছে।

“আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম। প্রবাসীদের সফলতার গল্প
ছবি সংগ্রহ ওয়েবসাইট থেকে

মূলত মধ্য প্রাচ্যে কাঁচামাল সরবরাহের জন্য আল হারামাইনের বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও কারখানার রয়েছে।

জনাব মাহাতাবুর রহমান বলেন, “আমাদের থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় কারখানা রয়েছে এবং আমরা কেবল সেখানে ওউধ তেল তৈরি করি।” আজমান কারখানা থেকে একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, প্যাকেজিং এবং সর্বশেষে উৎপাদন হয়ে বেরিয়ে আসে। তিনি আরও বলেন, “আল হারামাইন বডি লোশন এবং সুগন্ধির জন্য প্যারিস থেকে কাঁচামাল সরবরাহ করে।”

তিনি বলেন, “আমাদের এখানে আতর, সুগন্ধি, বডি লোশন, বডি স্প্রে এবং অন্যান্য বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন যে উচ্চ মানের কিছু পণ্য খুব যত্ন সহকারে তৈরি হয় তাই এটি অনেক ব্যয়বহুল হয়।

শীর্ষ উৎপাদক হিসেবে আল হারামাইন পারফিউম এর র‌্যাঙ্কিং সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি দেশের এক নম্বর পারফিউম প্রস্তুতকারক নই। তবে আমি ওউধ ও আগরকাঠ উৎপাদকের দিক থেকে হতে পারি। অন্যান্য পণ্যের জন্য অনেক প্রতিযোগী রয়েছে।”

“আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম। প্রবাসীদের সফলতার গল্প
ছবি সংগ্রহ ওয়েবসাইট থেকে

তিনি বলেন, বাজারে পণ্য নিয়ে আসা এবং বিক্রয় করা সহজ। মধ্য প্রাচ্যে এমন অনেক লোক আছেন যারা আমদানি করে পণ্য বিক্রয় করছেন। আমরা তা করি না। কোন একটা পণ্যের ধারণা, ডিজাইন, পণ্যের কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদন করা পর্যন্ত একটি একক পণ্য বাজারে আনতে আমাদের প্রায় এক বছর সময় লাগে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, “আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে পণ্য উৎপাদন করে গর্বিত এবং এই পণ্যগুলি জিসিসি, ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া এবং মধ্য প্রাচ্য সহ বিশ্বের ৪০ টিরও বেশি দেশে পাওয়া যায়।” উপসাগরীয় দেশগুলিতে এই প্রতিষ্ঠানের ৪৫ টিরও বেশি শোরুম রয়েছে।

“এই সুগন্ধি শিল্পে, আমাদের বয়স ৪০ বছরেরও বেশি এবং ইতিমধ্যে আমরা আমাদের রফতানির লক্ষ্য মাত্রা অর্জন করেছি। আমরা ইউরোপের প্রধান দেশগুলিতে, প্রায় সমস্ত মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিতে, চীন, ভারত এবং পাকিস্তান সহ শীর্ষ এশীয় দেশগুলিতে পণ্য রফতানি করি। আমাদের পণ্য দুবাই, আবুধাবি এবং শারজাহ বিমানবন্দরগুলির সমস্ত দোকানে শুল্কমুক্ত পাওয়া যায়।”

যমুনা ফিউচার পার্কে বাংলাদেশে আল-হারামাইন এর প্রথম দোকান। এর এক বছর পরে, বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সের নিচতলার আরো একটি দোকান রঙিন সুন্দর সুন্দর পাত্রে সুগন্ধি এবং আতর দিয়ে সাজানো রয়েছে। সুগন্ধি প্রেমীদের কাছে এই ব্র্যান্ডটি ইতিমধ্যে সুপরিচিত। তাই আজ “আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম।

আল-হারামাইন শোঁরুমে যাওয়ার সাথে সাথে আপনাকে সুগন্ধির সৌরভ পরীক্ষা করার জন্য একটি ছোট কাগজে সুগন্ধি দেওয়া হবে। যা আপনি আপনার নাকের কাছে নেওয়া মাত্রই আপনার মনে হবে আপনি আরব্য রজনীর রুপকথার গল্পে পৌঁছে গেছেন।

আল হারামাইনের শুধু আতরই নয়, বিভিন্ন আকারের কাচের বোতলও আকর্ষণীয়। ইসলামী ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। আল হারামাইন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি বোতলগুলিতে সুন্দর ও আকর্ষণীয় নকশা থাকে। মূল্যবান পারফিউম সহ পাত্রগুলি, আরব মরুভূমি এবং অতীতের বাদশাহ দের সুগন্ধযুক্ত বিলাসবহুল জীবনকে মনে করিয়ে দেয়।

আল-হারামাইনের সর্বনিম্ন মূল্যের বোতলটির দাম পড়বে সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা সর্বোচ্চ্য ৪ লাখ টাকা।

এবং আল-হারামাইনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আতরকে বলা হয় ‘হাজার’। এর এক আউন্সের দাম প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা।

জনাব মাহতাবুর রহমান বলেন যে, “আল হারমাইন গ্রুপের কোম্পানির পণ্যগুলির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এর উৎপাদন বৃদ্ধি করার ক্ষমতা রয়েছে। আমাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তবে এখনই নয়, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে হতে পারে। “আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম । আজমান শিল্পাঞ্চলে আমাদের বিদ্যমান কারখানার পাঁশে আমাদের আরও একটি বড় প্লট রয়েছে। তাই আমাদের কারখানা ও উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে কোন সমস্যা নেই।”

প্রথম থেকে, আল হারামাইন একটি ভিন্নধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। এটি এমন একটি সুগন্ধি যা কেবল আতর এবং এর সমৃদ্ধ ঐতিহ্যগুলিকেই উপস্থাপন করে না, বরং মানবিক চেতনাকে অনুপ্রাণিত ও লালিত করে। “আল-হারামাইন” একটি সফলতার নাম

উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় এক শতাধিক স্টোর এবং বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার ডিলার এবং ক্রেতা সহ আল হারামাইন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সুগন্ধির প্রস্তুতকারক এবং বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। আল হারামাইন তাদের প্রতিটি বোতলে আমাদের জীবনে ঐতিহ্য এবং একটি ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা দেয়।

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *